বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ০৩:২২ অপরাহ্ন

কংক্রিটের নগরে একটি গাছের ‘অবাক’ বেঁচে ফেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০১৬ সালের অক্টোবর মাস। আজিমপুর সরকারি কলোনির গেটের সামনে ঠাঁয় দাঁড়ানো একটি লম্বা সবুজ মেহগনি গাছ। পথিকের ছায়া দেওয়া ও প্রশান্তি ছড়ানো গাছটি কাটার আবেদন করলো আজিমপুর গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন। কারণ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সম্পত্তি বিভাগে জমা দেওয়া আবেদনে বলা হলো, মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান ফটক দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার সময় গাছটির কারণে আজিমপুর সড়কের দক্ষিণ দিক থেকে আসা যানবাহনের গতি বোঝা যায় না। এছাড়া এ গাছটি ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো সময় হেলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অভিযোগ ঠিকঠাক যাচাই করলো না ডিএসসিসি। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর গাছটি কেটে ফেলতে দরপত্র আহ্বান করলো। চূড়ান্ত দরপত্রে গাছ কাটার কাজ পেলো ডি এ এন্টারপ্রাইজ। ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গাছটির ডাল-পালা ও চারপাশের শিকড় কেটে ফেললো। পরদিন গণমাধ্যমে এই গাছ কাটার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রচার হলো সংবাদ। নগর ভবনের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ বসলো নড়েচড়ে। বোধোদয় হলো সিটি করপোরেশনের। তাৎক্ষণিক নগরে গাছ কাটা বন্ধ এবং এই মেহগনি গাছটি বাঁচাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিলেন তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। প্রাণে রক্ষা পেলো গাছটি।

পাতা নেই, ডাল নেই। চারপাশের মাটি খোঁড়া। শিকড় সব কাটা। আছে শুধু মূল শিকড় আর ২০-২৫ ফুটের একটি গুঁড়ি। অনেকটা ঢাল-তলোয়ারহীন ‘নিধিরাম সর্দারের’ মতো দাঁড়িয়ে থাকলো গাছটি! এরপর একে একে কেটে গেছে ছয়টি বছর। গাছটির বয়স এখন ৫৫ প্রায়। কেমন আছে সেই ‘সৌভাগ্যবান’ গাছটি? তা দেখতে সোমবার (২২ মে) সকালে আজিমপুরে যান এই প্রতিবেদক।

আজিমপুর গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের ফটক সংলগ্ন ফুটপাত ঘেঁষে এখনো সদর্পে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়েছে মেহগনি গাছটি। মূল গাছে ফের গজিয়েছে ডাল-পালা। বসন্তের কচি পাতা বর্ষায় এসে রূপ নিয়েছে সতেজ সবুজে। দূর থেকে গাছটির আগের বড় ডাল কাটা অংশ এখন দেখা যায় না। তবে বড় ডালহীন গাছটির শিকড়ের অংশে কুড়ালের কোপের চিহ্ন এখনো দগদগে। শুকায়নি সে ক্ষত।

আজিমপুর গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয় ছিল সরকারি উত্তরাঞ্চল কলোনিতে। এখন সেই কলোনির সবকটি পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন বহুতল ভবন তৈরি করা হচ্ছে। ফলে কলোনির কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে আজিমপুর চায়না বিল্ডিং গলির বাসিন্দা ও নিউ মার্কেটের দোকানি আহসান উদ্দিন  বলেন, এই মেহগনি গাছটি কাটার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। সিটি করপোরেশনও কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করে গাছটি কাটতে দরপত্র চূড়ান্ত করেছিল। যদিও পরবর্তীসময়ে নগর কর্তৃপক্ষের বোধোদয় হয়।

প্রতিদিন পশ্চিম পলাশী থেকে হেঁটে নীলক্ষেতে যান একটি বইয়ের দোকানের কর্মচারী আজিজুল হক। তিনি বলেন, আগের বড় ডাল-পালা কেটে ফেলার পর এই এলাকাটি এখনো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। তবে গাছটিতে নতুন ডাল-পাতা ছাড়ায় দেখতে ভালো লাগছে। সিটি করপোরেশনকে গাছ রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

এই গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে নিয়মিত কলেজে যান ইডেন মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী জান্নাতুল। তার বাসা আজিমপুরের নিউ পল্টন লাইনে। আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ছয় বছর আগে যখন ডালহীন গাছটির দিকে তাকাতাম মনে দাগ কাটতো। তবে এখন গাছটিতে ডাল-পালা ও নতুন পাতা গজানোয় মনে স্বস্তি লাগছে।’

আজিমপুর এলাকাটি ডিএসসিসির ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন। এই এলাকার কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ওই সময়ে গাছটি ঝুঁকিপূর্ণ অজুহাতে নামমাত্র মূল্যে দরপত্র আহ্বান এবং গাছের ডাল-পালা কাটা হয়েছিল। পরে গাছটি বাঁচাতে উদ্যোগ নিয়েছিল ডিএসসিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এখন গাছটি আগের রূপে ফিরেছে। গাছের ছায়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছেন পথচারীরা।

নগরে গাছ লাগিয়ে সবুজায়নের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের অন্যতম কাজ। সেখানে নগর কর্তৃপক্ষ কীভাবে সেসময় একটি জীবিত গাছ কেটে ফেলতে দরপত্র আহ্বান করেছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মেহগনি গাছের দরপত্র আহ্বানের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। যখন বিষয়টি জানলাম, তাৎক্ষণিক গাছ কাটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। গাছটি কীভাবে বাঁচানো যায়, তা জানতে সরকারের বন বিভাগে চিঠি দিয়েছি। তখন দুজন গাছ গবেষক মেহগনি গাছটি পরিদর্শন করেন। তারা গাছটির গোড়ায় মাটি ফেলাসহ অন্য পরামর্শ দেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করায় গাছটি বেঁচে যায়। আবার নতুন করে ডাল-পালা, পাতা ছাড়তে দেখেছি।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা মোহাম্মদ হানিফ তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। তিনি ঢাকা শহর সবুজায়নে সড়ক বিভাজকে বহু গাছ লাগিয়েছেন। এজন্য ১৯৯৬ সালের পরবর্তী সময়ে বৃক্ষরোপণে ভূমিকা রাখায় পরপর তিনবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম পুরস্কার নিয়েছিলেন। এখন সাতমসজিদ রোডসহ নগরের অন্য এলাকায় সড়ক বিভাজকের যেসব বড় গাছ দেখা যায়, তার অধিকাংশই মেয়র মোহাম্মদ হানিফের সময়ে লাগানো। এ শহরের পরিবেশের জন্য গাছগুলো রক্ষায় ডিএসসিসির বর্তমান পরিষদ আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করি।’

সম্প্রতি অবকাঠামো উন্নয়নের নামে রাতের আঁধারে ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে শতাধিক বড় গাছ কেটে ফেলেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এ ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, নগর ভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের এ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে যোগ দিয়েছেন পরিবেশবাদীরাও। তারা সবাই নগর কর্তৃপক্ষের কাছে গাছ কাটা বন্ধসহ চার দফা দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশন এ সড়কে গাছ কাটার পক্ষে অনড়।

গত ১০ মে ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে সাতমসজিদ রোডে গাছ কাটার বিষয়ে সাংবাদিকদের ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, নগর উন্নয়নের প্রয়োজনে ধানমন্ডি এলাকায় যে পরিমাণ গাছ কাটা হবে তার তিনগুণ লাগানো হবে। গাছ কাটা নিয়ে কেউ কেউ মর্মাহত হতেই পারেন, কষ্ট পেতেই পারেন। এটা তাদের আবেগের বিষয়। তবে কোথাও একটা গাছ অপসারিত হলে সেখানে আমরা তিনটা গাছ লাগানোর লক্ষ্যে কাজ করছি।

মেয়রের এমন কথার পর গত ১৯ মে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, তারা সাতমসজিদ রোডের এক দশমিক সাত কিলোমিটার অংশে বিভাজকে (মিডিয়ান) রঙ্গন, কামিনী, বাগান বিলাস, চন্দ্রপ্রভা (টেকোমা) ও কাঞ্চন ফুলের ৬৫০টি গাছ লাগিয়েছেন। এই ফুলগাছ লাগাতে তাদের প্রয়োজনীয় ভিটি বালু, মাটি, গোবর ও সার কিনতে ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © gtbnews24.com
Web Site Designed, Developed & Hosted By ALL IT BD 01722461335