সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ১০:৪২ পূর্বাহ্ন

ভাগাড়ে পড়ে আছে বিলাসবহুল বাস, গায়েব হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: টিপু সুলতানের নাম শোনেননি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। টিপু সুলতান ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের মহীশুর রাজ্যের শাসনকর্তা। তার বীরত্ব দেখেছে ইংরেজরা। বগুড়ায়ও আছেন এক টিপু সুলতান! তবে বীরত্ব নয়, কুকীর্তির জন্যই এ টিপুর পরিচিতি।

ঋণের নামে হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চুষে নিয়েছেন এই পরিবহন ব্যবসায়ী। এখন বাঘা বাঘা ব্যাংক কর্মকর্তাকে ঘোল খাইয়ে ছাড়ছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) খাতায় টিপু ঋণখেলাপির ‘রাজা’। সংস্থাটির ঋণখেলাপির ২০০ জনের তালিকায় রয়েছে তার নাম।

টিপু সুলতান ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘টিআর ট্রাভেলস’কে। সেই পরিবহন এখন দেউলিয়া। ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা বাসগুলো ফন্দি এঁটে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। সেই অত্যাধুনিক বাসগুলোর খোঁজ পাওয়া গেছে। বগুড়া ও খুলনার পরিত্যক্ত জঙ্গল আর ভাগাড়ে কৌশলে ফেলে রাখা হয়েছে হুন্দাই, মার্সিডিজ, ভলভোর মতো দামি বাস। অযত্নে ফেলে রাখা এই বাসগুলোর জন্যই জামানত ছাড়া বিপুল টাকা লগ্নি করে কয়েকটি ব্যাংক।

অভিযোগ রয়েছে, একই গাড়ি বারবার একাধিক ব্যাংককে দেখিয়ে ঋণের টাকা তুলে পরিবহন ব্যবসায় না খাটিয়ে টিপু তা দেশের বাইরে পাচার করেছেন।

এদিকে, ঋণের নামে ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা বের করে পাচারের সঙ্গে জড়িত টিপুর বিরুদ্ধে তদন্তে রয়েছে দুদক। টিপুকে ধরতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তাঁকে ‘খুঁজে পাওয়া’ যাচ্ছে না।

কে এই টিপু সুলতান
বগুড়া শহরের দক্ষিণ চেলোপাড়া-নারুলী এলাকার মৃত মালেক মণ্ডলের ছেলে টিপু। মালেক বৈবাহিক কারণে অনেক আগে থেকেই বাস করতেন খুলনার রেলগেট এলাকায়।
টিপু ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। পণ্য আমদানি করতেন সীমিত পরিসরে। ভোগ্যপণ্য ও পরিবহন খাতের ব্যবসায়ী হলেও টিপু ঋণ নিয়ে বনে যান খুলনার প্রভাবশালী পাট ব্যবসায়ী। বেশি দামে পাট কিনে, কম দামে রপ্তানি-এই ছিল তার গোপন ফর্মুলা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানিতে স্বর্ণপদক বাগাতে বাকিতে কিনে এই প্রক্রিয়ায় পাট রপ্তানি করতেন টিপু।

একাধিক ব্যাংকের ঋণখেলাপি হলেও খুলনায় তার জীবনযাপন ছিল রাজকীয়। টিপুর নাটকীয় উত্থান হয় ২০০৯ সালে। ডজনখানেক ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিবহন ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তার মালিকানাধীন এসি, নন-এসি বাস চলাচল করতো ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন পথে। তবে সবই এখন অতীত। বাছবিচার না করে জামানত ছাড়াই টিপুকে ঋণ দেয় বিভিন্ন ব্যাংক। ২০০৯ সালে এই ব্যবসায়ীকে সাদা মনে প্রথম ১১০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল রূপালী ব্যাংকের দৌলতপুর শাখা। তবে সেই ঋণের এক টাকাও ব্যাংকটি ফেরত পায়নি। এর মধ্যে ২০১৬ সালের মার্চে জনতা ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের দায়ে দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। জামিনে ছাড়া পেয়ে এর পর থেকেই লাপাত্তা।

অনুসন্ধান বলছে, টিপু এখনো দেশেই আছেন। কখনো রাজধানীর উত্তরায় আধুনিক ফ্ল্যাটে থাকেন আবার কখনো খুলনার দৌলতপুরে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গোপনে অবস্থান করেন। ব্যবসার খোঁজ-খবর নিতে মাসে একবার বগুড়ায়ও ঢু মারেন।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি পরিবহন ব্যবসার নামে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন, এর মাত্র ১০ শতাংশ বিনিয়োগ করেছিলেন। বাকি টাকা সরিয়েছেন বিদেশে। তার স্ত্রী সোহেলী পারভীনের আগের স্বামীর দুই ছেলেমেয়েকে পড়াচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার বনেদি দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। গুঞ্জন রয়েছে সেখানেও একাধিক ব্যবসা খুলে বসেছেন টিপু।

কোন ব্যাংক থেকে কত ঋণ
টিপুর কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পাবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের রয়েছে ১১০ কোটি টাকার ঋণ। এর বাইরে টিপুর কাছে ৯০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল)। এছাড়া এবি ব্যাংক পাবে ৭০ কোটি, এক্সিম ব্যাংক ১৫০ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংক ৫০ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৩০ কোটি, ইসলামী ব্যাংক ৩ কোটি, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ২ কোটি, ইউসিবি ৩ কোটি ও প্রাইম ব্যাংক ৩ কোটি টাকা টিপুর কাছে পাবে। সুদাসলে এসব ঋণের টাকা এখন অনেক বেড়েছে। এছাড়া নামে-বেনামে আরও বেসরকারি অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও শত কোটি টাকার ওপরে ঋণ রয়েছে তার।

পরিবহন ব্যবসার হালচাল
পরিবহন ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন টিপু সুলতান। সচল বাস অচল দেখিয়ে সরিয়ে ফেলেছেন ডাম্পিং স্টেশনে। বগুড়া শহরের গোকুল ও বনানী পেট্রল পাম্প এলাকায় এবং খুলনার দৌলতপুরে জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বড়বড় বাস। রাতারাতি দেউলিয়া হয়ে যায় লাভজনক ‘টিআর ট্রাভেলস’। এখন টিআর ট্রাভেলস নামে যেসব গাড়ি মহাসড়কে চলছে, এর সবগুলোই ভাড়ায়চালিত।

নিজেদের দুই শতাধিক আধুনিক গাড়ি মহাসড়ক থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে টিআর ট্রাভেলসের কাউন্টারগুলো বন্ধ। একই অবস্থা রংপুর নগরেও। সেখান থেকে টিআর ট্রাভেলসের কোনো গাড়ি চলাচল করছে না। বগুড়া শহরের সাতমাথায় ছোট্ট পরিসরে একটি কাউন্টার খোলা রাখা হলেও সেখান থেকে ভাড়ায় নেওয়া ভাঙাচোরা চার-পাঁচটি গাড়ি চলাচল করে।

বিভিন্ন ব্যাংকের সূত্র জানায়, তাদের কাছে থেকে টিপু প্রধান ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা ছাড়াও একাধিক ব্যবসার বিপরীতে ঋণ নিয়েছেন হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে যে দায় (মর্টগেজ) দিয়েছেন তা দশ ভাগের এক ভাগও নয়। এ কারণে ব্যাংকের টাকা সহজে হজম করে তিনি এখন কাগুজে ফেরারি। তার দেখানো ব্যবসাগুলোর প্রায় সব এখন বন্ধ। অভিযোগ রয়েছে, বেনামে স্বজনদের দিয়ে ভিন্ন উপায়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন তিনি।

শুধু বগুড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে টিপু সুলতান এবং তার পরিবারের সদস্যদের পরিচালনায় মিলেছে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, পাটের গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ, জুট মিল অন্যতম। এছাড়া বেনামে শতশত বিঘা জমি কিনেছেন- এমন তথ্যও রয়েছে। খুলনায় তার বড় পাটগুদাম এবং অন্য ব্যবসা রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা।

মামলা করেও আদায় হচ্ছে না ঋণের টাকা
যাচাই-বাছাই না করে টিপু সুলতানকে জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলো এখন টাকা আদায়ে গেছে আদালতে। তবে খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না তারা। ঢাকা ট্রেডিং হাউস লিমিটেড, টিআর স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ এবং টিআর ট্রাভেলসের নামে ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়েছিলেন টিপু। সব প্রতিষ্ঠানই এখন খেলাপি। ব্যাংকগুলো অধিকাংশ ঋণই দিয়েছে জামানত ছাড়া। টিপুর কাছ থেকে টাকা আদায়ের সম্ভাবনাও সে কারণে ক্ষীণ।

সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কামাল হোসেন দাবি করেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই তারা টিপু সুলতানকে ঋণ দিয়েছিলেন। ঋণের পুরো টাকাই এখন মন্দ মানের খেলাপি। টিপু সুলতান এখন কোথায় আছেন, কী করছেন, সে বিষয়েও তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই

তিনি বলেন, আমরা টাকা আদায়ের জন্য টিআর ট্রাভেলসের তিনটি গাড়ি জব্দ করেছিলাম। তবে পরিবহন শ্রমিক নামধারী সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে টিপু সেগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। টাকা আদায়ে সেই থেকে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলছে।

টিপু সুলতানকে ঋণ দিয়ে বিপত্তিতে আছে বিডিবিএলও। ব্যাংকটির দ্বিতীয় শীর্ষ ঋণখেলাপি ঢাকা ট্রেডিং হাউস এবং পঞ্চম শীর্ষ খেলাপি টিআর স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ। এ দুই প্রতিষ্ঠানেরও চেয়ারম্যান টিপু সুলতান। প্রতিষ্ঠান দুটির কাছে বিডিবিএলের পাওনা দাঁড়িয়েছে শত কোটি টাকা। ২০১২ সালে এই ঋণ দেওয়া হয়েছিল। এই ব্যাংকও অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে।

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে ২৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেন টিপু সুলতান। এ অভিযোগে ২০১৬ সালে মতিঝিল থানায় মামলা করে দুদক। সে মামলায় গ্রেফতারও হয়েছিলেন তিনি। এখন সুদসহ তার কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি টাকা।

ঋণের টাকা ফেরত পেতে টিপু সুলতানের নামে মামলা ঠুকেছে এক্সিম ব্যাংকও। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য
বগুড়া ডিবি পুলিশের ইনচার্জ সাইহান ওলি উল্লাহ বলেন, টিপুর বিষয়টি নিয়ে বগুড়ায় কোনো অভিযোগ নেই। এটা ঢাকায় তদন্ত হচ্ছে। তাকে ঢাকাতেই খোঁজাখুঁজি করা হচ্ছে। বগুড়ায় কোনো মেসেজ এলে তাকে গ্রেফতারের জন্য গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুদক বগুড়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, দুদকের মামলাটির বিষয়ে বগুড়ায় কোনো নির্দেশনা নেই। এটা ঢাকা থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। আমাদের নির্দেশনা দিলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবো।

টিপুর সঙ্গে কথা বলা যায়নি
এসব বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার চেষ্টা করেও টিপু সুলতানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। পরে তার বড় ভাই ও টিআর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওহিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা ব্যাংকের দেনা শোধ করে আবার ব্যবসা গোছানোর চেষ্টা করছি।

তিনি দাবি করেন, ব্যাংক ঋণের বড় একটি অংশ তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা আত্মসাৎ করেছেন। দেশের বাইরে টাকা পাচারের তথ্য ঠিক নয়। টিপু সুলতান দেশেই আছেন বলে তিনিও স্বীকার করেন।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © gtbnews24.com
Web Site Designed, Developed & Hosted By ALL IT BD 01722461335