মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:২৮ পূর্বাহ্ন

নোটিশঃ
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জিটিবি নিউজ এর সাংবাদিক  নিয়োগসহ পরিচয় পত্র নবায়ণ চলছে।

প্রাণ ফিরছে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে, সাজবে নান্দনিক রূপে

নিজস্ব প্রতিবেদক: বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল দিয়ে রায়েরবাজার থেকে নৌকায় ঢাকার লালবাগ-চকবাজার যাওয়া যেত এক সময়। বর্ষা মৌসুমে নদী টইটম্বুর থাকতো পানিতে। দুই পাড়ের মানুষ নদীতেই গোসল করতো। রান্না-বান্নার কাজেও ব্যবহার হতো নদীর পানি। সবই এখন অতীত। দখল-দূষণে প্রায় বিলীন সেই চ্যানেল। সম্প্রতি বুড়িগঙ্গা নদীর সেই আদি চ্যানেল উদ্ধারে টানা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। নদীতে পানিপ্রবাহ সৃষ্টি করতে খনন কাজও চলমান। সিটি করপোরেশনের এমন উদ্যোগে সন্তুষ্ট স্থানীয় বাসিন্দারা।

ঢাকার জনজীবন ও পরিবেশের জন্য এমন ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে একশ্রেণির মানুষ। তাদের অভিযোগ, নদীর জায়গা বলে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে যাচ্ছে ডিএসসিসি। সময়-সুযোগ না দিয়ে মালামালসহ বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এতে পথে বসে গেছে অসংখ্য পরিবার।

এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, তারা সিএস জরিপ ধরে খালের সীমানা বের করছেন। সে অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযান চলছে। এ নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ নেই।

ডিএসসিসি সম্পত্তি বিভাগ সূত্র জানায়, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের সীমানা কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ থেকে রায়েরবাজার পর্যন্ত। প্রায় সাত কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই চ্যানেলের অনেক অংশ ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গত আগস্ট থেকে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানোর পাশাপাশি চ্যানেলটির খননকাজও শুরু হয়েছে। এই খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা। বুড়িগঙ্গা খননের কাজ শুরুর পর আদি চ্যানেল অনেকটাই দৃশ্যমান। দখল-দূষণে মৃতপ্রায় চ্যানেলটিতে এখন পানির প্রবাহ ফিরতে শুরু করেছে।

কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুরের প্রবীণ বাসিন্দা ইমতিয়াজ উদ্দিন। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, এক সময় বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল দিয়ে রায়েরবাজার থেকে নৌকায় ঢাকার লালবাগ-চকবাজার যেতাম। বর্ষা মৌসুমে এই চ্যানেলে পানি থৈ থৈ করতো। নদী থেকে মাছ ধরতাম। দুই পাড়ের মানুষ নদীর পানিতে গোসল করতো। রান্না-বান্নার কাজেও নদীর পানি ব্যবহার করতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে আদি চ্যানেল তার প্রাণ হারায়। এখন এই চ্যানেলে পানিপ্রবাহ ফেরাতে ডিএসসিসি যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে।

বুধবার (৯ নভেম্বর) বিকেল ৫টা। আদি চ্যানেলের পাড়ে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিলেন লালবাগের রিয়াজ উদ্দিন রোডের বাসিন্দা কামাল হোসেন। তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীর আদি চ্যানেল নিয়ে সরকারের কোনো সংস্থার মাথাব্যথা ছিল না। ফলে যে যেভাবে পারছে, নদী দখল করছে। নদীর বুকে অসংখ্য বহুতল ভবন এবং স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ময়লা-আবর্জনায় নদীটি প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। হেঁটে নদী পার হচ্ছেন মানুষ। অথচ একটা সময় যখন সড়কপথ ছিল না, তখন এই নদীপথই যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল।

হাজারীবাগের কালুনগর এলাকা নিয়ে বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল রায়েরবাজারে নদী বয়ে গেছে। তবে কালুনগর এলাকায় গিয়ে আদি চ্যানেলের দেখা মিলবে না। এখানে আদি চ্যানেলটি একটি খালে রূপ নিয়েছে। এই খালটি কালুনগর খাল নামে পরিচিত। এই খালের পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বহু স্থাপনা।

কালুনগর এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা সাইফুল তালুকদার। কালুনগরে একটি মুদি দোকান চালান। আলাপকালে তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে হাজারীবাগের এই অংশ ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হতো। চারপাশ ফাঁকা ছিল। তেমন কোনো বাড়িঘর বা গাছপালা ছিল না। সারাবছরই নদীতে পানিপ্রবাহ ছিল। বর্ষায় নদীর সীমানা বোঝা যেত না। অথচ এই নদী এখন খালে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি আদি চ্যানেলের মূল সীমানা উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে ডিএসসিসি। এতে নদীটির দিকে তাকালেই পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে।

আদি চ্যানেল উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুজ্জামান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, স্বাধীনতার আগে ও পরে অনেকেই নকল কাগজপত্র তৈরি করে বুড়িগঙ্গা নদীর আদি চ্যানেল দখল করেছিলেন। সিটি জরিপে অনেকেই দখল করা জায়গা বৈধ করে নেন। কিন্তু এখন আমরা সিএস জরিপ ধরে খালের জায়গা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করছি। এতে কারও আপত্তি তোলার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, উচ্ছেদ অভিযান শুরুর পর অনেক ভবন মালিক নিজ উদ্যোগে ভবন ভেঙে ফেলেছেন। কেউ কেউ জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন এই আদি চ্যানেলের প্রাণ ফেরাতে স্থানীয়দের মধ্যে জনমত তৈরি হয়েছে।

গত ২ নভেম্বর বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেলে চলমান খনন, পরিষ্কারকরণ ও উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। তখন তিনি বলেন, আমরা গত অক্টোবর থেকে আদি বুড়িগঙ্গা খনন, সীমানা নির্ধারণ এবং দখলমুক্ত করার কার্যক্রম শুরু করেছি। এখানে বিভিন্ন কারখানা, বড় বড় ভবন, দশতলা ভবন- সেগুলো ভাঙার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। নদীর পাশ দিয়ে দুটি ঢাল বা দুটি তীর এখন দৃশ্যমান। এ কার্যক্রম চলমান থাকবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত পূর্ণরূপে আমরা আদি বুড়িগঙ্গা ফিরিয়ে আনতে না পারবো ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কাজ চলমান থাকবে।’

বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেলের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ডিএসসিসি মেয়র বলেন, আদি বুড়িগঙ্গা খননের পর একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দু’পাশ দিয়ে হাঁটার পথ, সাইকেল চালানোর পথ এবং নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করা হবে। যদিও এটা অত্যন্ত দুরূহ এবং বিশাল কর্মযজ্ঞ। আমরা শুরু করেছি মাত্র, একটু সময় লাগবে। কিন্তু আমরা আশাবাদী, ঢাকাবাসী একটি নান্দনিক পরিবেশ পাবে। নদী ফিরে পাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © gtbnews24.com