সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৪২ অপরাহ্ন

নোটিশঃ
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জিটিবি নিউজ এর সাংবাদিক  নিয়োগসহ পরিচয় পত্র নবায়ণ চলছে।

৯ জন দিয়ে চলছে পুরো জেলা লালমনিরহাট টেলিফোন ভবনে জনবল সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক: এক সময়ের জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম ছিল টেলিফোন। যুগের পরিবর্তনের ফলে টেলিফোনের পরবর্তীতে এসেছে মোবাইল ফোন। মোবাইল ব্যবহারের সাথে সাথে কমতে শুরু করেছে টেলিফোনের ব্যবহার।

সীমান্তবর্তী পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত জেলা লালমনিরহাট। জেলা শহরে টেলিফোন ভবন ও প্রতিটি উপজেলার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ (টিএনটি) সুসজ্জিত থাকলেও জনবলের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে বড় বড় ভবন। দিন দিন টেলিফোনের চাহিদা কমার পাশাপাশি অফিস পাড়ার লোক সমাগম আর দেখা মেলে না। উপজেলাগুলোতে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিস জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। নেই সংস্কারের উদ্যোগ। দিনের পর দিন চলছে এভাবেই।

লালমনিরহাট জেলা ও পাঁচ উপজেলাসহ মাত্র ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়েই চলছে টেলিফোন ভবন। দীর্ঘদিন থেকে লোকবলের অভাবে অফিসগুলোর চিত্র পাল্টে গেছে। অফিসগুলোতে তেমন একটা কর্মতৎপরতা নেই বললেই চলে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসেই সময় কাটাতে দেখা যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, লালমনিরহাটের প্রাণকেন্দ্র মিশন মোড় রোডের পাশে অবস্থিত টেলিফোন ভবন। মাত্র দুজন কর্মকর্তা ও দুজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছে বিশাল এই ভবনে। একজন উপরের লাইন দেখাশোনা করছেন অন্যজন নিচেই বসে আছেন। প্রধান কর্মকর্তা একবার নিচে একবার উপরে লাইন দেখাশোনায় ব্যস্ত। এলাকাজুড়ে টেলিফোন ভবন। বেশকিছু কক্ষ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আগের এনালগ মেশিনের তার ও যন্ত্রপাতি পড়ে রয়েছে বারান্দায়।

এদিকে আদিতমারি উপজেলা টিঅ্যান্ডটি ভবনে দেখা গেছে, কামাল হোসেন নামে এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ভবনের নিচতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। লাইনম্যান কামাল হোসেনের খোঁজ করতে গেলে তার স্ত্রী বেরিয়ে এসে জানান, তিনি লালমনিরহাট টেলিফোন অফিসে কাজে গেছেন।

অন্যদিকে কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার টিঅ্যান্ডটি অফিসও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। এক্সচেঞ্জ অফিসের বড় টাওয়ারগুলো দাঁড়িয়ে আছে। নেই কোনো সংস্কার ব্যবস্থা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাটগ্রাম টিঅ্যান্ডটিতে একজন, কালীগঞ্জ টিঅ্যান্ডটিতে একজন, আদিতমারি টিঅ্যান্ডটিতে একজন, হাতীবান্ধা টিঅ্যান্ডটি অফিসের লোক বলতে কেউ নেই। সপ্তাহে দদিন এসে দেখাশোনা করে আবার লালমনিরহাট চলে যান।

এদের মধ্যে তিন উপজেলায় তিনজন এবং বাকি ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারী লালমনিরহাট টেলিফোন ভবনে কর্মরত। এভাবেই চলছে লালমনিরহাট টেলিফোন ভবন।

কর্মকর্তারা বলছেন, টেলিফোন ভবনের জন্য বরাদ্দ না আসায় এভাবেই পড়ে আছে।

লালমনিরহাট টেলিফোন ভবন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে টেলিফোনের গ্রাহক সংখ্যা ৫৪১ জন। এর মধ্যে পাটগ্রাম উপজেলায় ১৬ জন, হাতীবান্ধা উপজেলায় ৩০, কালীগঞ্জ উপজেলায় ৩০ ও আদিতমারী উপজেলা ৩৮ জন গ্রাহক।

প্রতি উপজেলায় এনালগ সাংগাইবেল (এস ১২) যন্ত্রটি অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বর্তমানে নতুন (এমওটিএন) যন্ত্রপাতির মাধ্যমে চলমান টেলিফোন ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু আছে। প্রতি মাসে টেলিফোন টু টেলিফোন কথা বলে ১৭৩ টাকা করে বিল পরিশোধ করতে হয়। ইন্টারনেটে ১০ জিবি এক মাসে ৭৫০ টাকা বিল প্রদান করতে হয়।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রতিটি টেলিফোন ভবনে চালু হবে ‘জিপন’ নামে একটি নতুন ডিজিটাল সিস্টেম। পার্শ্ববর্তী কুড়িগ্রাম জেলায় এর কাজ চলমান, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ লালমনিরহাটে জিপনের কাজ শুরু হবে।

এদিকে মোবাইলের যুগে ধারাবাহিকভাবে কমছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) টেলিফোন গ্রাহক সংখ্যা। সময়মতো গ্রাহকদের সার্ভিস না দেওয়ায় টেলিফোনের বেহাল অবস্থা হয়েছে। দিন দিন গ্রাহকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

টেলিফোনের বেহাল অবস্থায় অনেকেই বাড়ির পুরোনো বিল শোধ করে ল্যান্ডফোন জমা দিচ্ছেন। বিটিসিএল সরকারি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সেবা দেয়। গ্রাহকদের যথাযথ সেবা দেওয়ার মতো জনবলও তাদের নেই।

আদিতমারী উপজেলার ফরহাদ আলম সুমন  বলেন, গত দুই বছর আগে টেলিফোন জমা দিয়েছি। আগের মতো আর টেলিফোনের প্রয়োজন হয় না, মোবাইলই যথেষ্ট। গত এক বছর টেলিফোন পড়েছিল তারপরও বিল দিতে হয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলার টিঅ্যান্ডটির মাস্টাররোলে থাকা লাইনম্যান রায়হান ইসলাম  বলেন, কালিগঞ্জ এক্সচেঞ্জ অফিসে লাইনম্যান হিসেবে কাজ করছি। বেতন-ভাতা কিছুই নেই। টেলিফোন আর আগের মতো চলে না। নতুন লাইন এসেছে কাজ করছি, যদি চাকরিটা আমার হয়।

তিনি আরও জানান, কালীগঞ্জ উপজেলায় গ্রাহক সংখ্যা বাড়ছে কারণ একতারে ইন্টারনেট এবং ল্যান্ডফোনের সেবা। ইন্টারনেটের গতিও ভালো তাই এ এলাকায় গ্রাহক বাড়ছে।

হাতীবান্ধার স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক বলেন, টেলিফোন আর কাজে লাগে না। এই অফিসে কোনো লোক আসে না। মাঝে মাঝে একজন এসে দেখে আবারও চলে যায়। বর্তমানে এই টাওয়ারটি টেলিটক সিমের টাওয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

টেলিফোন গ্রাহক হাতীবান্ধা উপজেলার ব্যবসায়ী রমজান আলী বলেন, মোবাইল আসার পর টেলিফোনটি কাজে লাগেনি। ব্যবসায়িক কাজে মোবাইলে কথা বলা, এমনকি লেনদেনও করা যায়। তাই ২০১৩ সালে টেলিফোনটি জমা দেই।

লালমনিরহাট টেলিফোন অফিসের জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (রাজস্ব) ফিরোজ আল হুসাইন  বলেন, জনবলের অভাবে টেলিফোনের বেহাল অবস্থা। সঠিক সময়ে লাইন সংস্কার না করায় গ্রাহকরা টেলিফোন ফেরত দিচ্ছেন। এতে দিন দিন রাজস্ব কমে যাচ্ছে। তাই রাজস্ব বাড়ানোর জন্য লোকবল এবং বরাদ্দ প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, আমার চাকরি মাত্র দুই মাস আছে; তাই আমার পক্ষে ভিডিওতে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়।

লালমনিরহাট জেলা টেলিফোন অফিসের জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (বিটিসিএল) সিরাজুল ইসলাম  বলেন, বর্তমানে নতুন সিস্টেমে এমওটিএনের সাহায্যে এক্সচেঞ্জ পরিচালনা করা হচ্ছে।

পুরোনো যন্ত্রপাতির মধ্যে (জেটি) ও (এস ১২) বন্ধ। লালমনিরহাটে গ্রাহক সংখ্যা মাত্র ৫৪১ জন। তার তুলনায় খুবই কম। বর্তমানে সরকারি অফিস-আদালতে টেলিফোনের ব্যবহার রয়েছে।

আগামীতে নতুন একটি ডিজিটাল সিস্টেম আসছে জিপন, তা চালু হলে গ্রাহকের ঘাটতি পূরণ হবে। ইন্টারনেটের বিষয়ে আমরা আরও অগ্রসর হবো।

তিনি আরও বলেন, জেলায় মাত্র ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে পরিচালনা করা খুবই দুষ্কর। জনবল বৃদ্ধি পেলে সংযোগ আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © gtbnews24.com