সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০৪:২২ অপরাহ্ন

নোটিশঃ
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জিটিবি নিউজ এর সাংবাদিক  নিয়োগসহ পরিচয় পত্র নবায়ণ চলছে।

অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট শুরু

জিটিবি নিউজ টুয়েন্টিফোর : নতুন সড়ক আইন বাতিলের দাবিতে দেশের বিভিন্নস্থানে পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে শ্রমিক ও মালিকরা। খুলনা-রাজশাহী বিভাগের পর মঙাগলবার বরিশালেও বাস চলাচল বন্ধ ছিল। রাজধানী ঢাকাতেও মঙ্গলবার গণপরিবহন কম ছিল। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। ৯ দফা দাবিতে বুধবার সকাল ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ।

নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করবে তারা।  মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সংগঠনটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করেন পরিষদের আহ্বায়ক রুস্তম আলী খান। এ সময় তিনি বলেন, ২০শে নভেম্বর থেকে পরবর্তী নির্দেশনা আসার আগ পর্যন্ত মালিক-শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করবেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের এ কর্মসূচি চলবে বলেও জানান তিনি। ৯ দফা দাবি তুলে ধরে রুস্তম আলী জানান, নতুন সড়ক আইন স্থগিত করে মালিক-শ্রমিকদের আয়ের সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ জরিমানার বিধান রেখে সংশোধন করে একটি বাস্তবসম্মত আইন প্রণয়ন করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু চালকদের দায়ি করা যাবে না। চালকের কোন মামলা হলে তা অবশ্যই জামিনযোগ্য ধারায় হতে হবে। সড়ক-মহাসড়কে গাড়ির কাগজপত্র চেকিং করার নামে পুলিশের অযথা হয়রানি বন্ধ করতে হবে। সকল ট্রাকস্ট্যান্ড অথবা লেডিং পয়েন্টে গাড়ির কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স চেকিং করতে হবে। বৈধ কাগজপত্র থাকলেও অযথা বিভিন্ন অজুহাতে মামলা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, নভেম্বর এর পূর্ব পর্যন্ত বিআরটিএ কর্তৃক রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত যে সকল পণ্য পরিবহন গাড়ি রপ্তানিযোগ্য পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা নির্ধারণ পূর্বক তৈরি করা হয়েছে, সে সকল গাড়ির মডেল থাকাকালীন অবস্থায় চলাচলের অনুমতি দিতে হবে। সহজ শর্তে স্বল্প সময়ের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে। যে সকল চালক যেসব গাড়ি চালানায় পারদর্শী তাদেরকে সেরকম লাইসেন্স দিতে হবে। বর্তমানে হালকা পেশাদার লাইসেন্স দিয়ে ভারী যানবাহন চালানোর অনুমতি দিতে দিতে হবে। জরিমানা মওকূফ করে গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ করার নূন্যতম ৬ মাস সময় দিতে হবে। রুস্তম আলী আরও বলেন, বিগত পণ্য পরিবহনের আন্দোলনে যেসকল মালিক-শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। সারাদেশে একই নিয়মে একই ওজনে ওভারলোডিং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সড়ক-মহাসড়কে ৩০ মিটারের মধ্যে কোন স্থাপনা থাকা যাবে না। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের সদস্য সচিব তাজুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক মকবুল আহমদ এবং যুগ্ম সদস্য সচিব তালুকদার মো. মনিরসহ মালিক শ্রমিক নেতারা। সংবাদ সম্মেলনের পর মালিক-শ্রমিকরা সংগঠনটির কার্যালয়ের সামনের সড়ক অবরোধ করে। এ সময় আশপাশের সড়কগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হয়। একই দাবিতে  মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের বিভিন্ন জেলায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা

বরিশালে বাস চলাচল বন্ধ
পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বরিশালের সকল রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার পর থেকে বরিশালের অভ্যন্তরীণ সকল রুট এবং দূরপাল্লার আংশিক রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনে জেল-জরিমানার ভয়ে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন তারা।
এদিকে কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা বলছেন, বিভিন্ন স্থানে বাস চলাচল করতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। ভাঙচুর করা হচ্ছে বাস। এছাড়া নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনে জেল-জরিমানা বেশি থাকায় শ্রমিকরা ভয়ে বাস চলাচল করা থেকে বিরত থাকছেন। এেেত্র মালিক-শ্রমিক নেতারা অসহায়। এরইমধ্যে মাদারীপুর এবং মোস্তফাপুরে বরিশাল রুটের দুটি বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। ঝালকাঠিতে বাস চলাচলে বাধা  দেয়া হচ্ছে। এসব কারণে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার পর বরিশাল নগরীর নতুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে অভ্যন্তরীণ এবং দূরপাল্লার কিছু রুটে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন শ্রমিকরা। তারা নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন সংশোধন কিংবা বাতিল না করা পর্যন্ত বাস চালাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কিশোর কুমার দে এবং  জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফরিদ হোসেন জানান, নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও ধর্মঘট কিংবা কর্মবিরতি করেননি। বিভিন্ন স্থানে বাধা এবং ভাঙচুরসহ নতুন আইনে জেল-জরিমানার ভয়ে শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন। তারা বাস চালানোর জন্য কোনও শ্রমিক খুঁজে পাচ্ছেন না। এেেত্র মালিক-শ্রমিকরা নিরুপায়।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ
নতুন পরিবহন আইন বাতিলের দাবিতে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় অবরোধ করেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে এ অবরোধ শুরু করেন তারা। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিার্থী ও অফিসগামী কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। শ্রমিকরা জানান, নতুন কার্যকর হওয়া সড়ক পরিবহন আইন বাতিলের দাবিতে তাদের এই অবরোধ। যতদিন এই আইন বাতিল না হবে, ততদিন তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। মাওনা হাইওয়ে থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আইয়ুব হোসেন জানান, ভর্তিচ্ছু শিার্থীদের কথা বিবেচনা করে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে একটি বাস ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আরও যদি কোনও ছাত্রছাত্রী থাকে তাদেরও পরীা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেয়ার চেষ্টা চলছে।
 বেনাপোল বন্দরে লোড আনলোড বন্ধ
বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি জানান, বাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় বেনাপোল বন্দর থেকে কোন মালামাল লোড আনলোড ও খালাস হয়নি। ফলে শতশত খালি ট্রাক পণ্য লোড করার জন্য বন্দরের সামনে অবস্থান করছে। তবে দু দেশের মধ্যে আমদানি রফতানি বাণিজ্যসহ পাসপোর্ট যাত্রী যাতায়াত ছিল স্বাভাবিক। তবে বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারি না হওয়ায় আজকের আমদানি পণ্য বন্দরে আনলোড করা সম্ভব হয়নি।
নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের প্রতিবাদে যশোর থেকে এই ধর্মঘট শুরু হয় রবিবার। আজ তা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। বাংলাদেশ পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোর্তজা হোসেন জানান, দণি-পশ্চিমাঞ্চলের দশ জেলায় পরিবহন শ্রমিকরা ‘স্বেচ্ছায়’ বাস চালাচ্ছেন না। জেলাগুলো হলো, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতীরা, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা।
শ্রমিকরা কাউকে ইচ্ছা করে হত্যা করে না জানিয়ে মোর্তজা বলেন, অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার জন্য নতুন সড়ক আইনে তাদেরকে ‘ঘাতক’ বলা হচ্ছে। তাদের জন্য এমন আইন করা হয়েছে যা সন্ত্রাসীদের েেত্র প্রযোজ্য।
নতুন আইনের অনেক ধারার ব্যাপারে শ্রমিকদের আপত্তি রয়েছে। সরকার সমাধানের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় শ্রমিকরা রবিবার দুপুর থেকে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন।”
গত বছর ঢাকায় বাসচাপায় দুই ছাত্র-ছাত্রীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালে আগের আইন কঠোর করে এই আইন করা হয়। এতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড ও অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে।
২০১৮ সালে পাস হওয়া এ আইন গত পহেলা নভেম্বর প্রজ্ঞাপনের জারি করা হয়। তবে আইনটি প্রণয়নের পর থেকেই এর প্রবল বিরোধিতা করে আসছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো।  অন্য দিকে আইনটি সম্পর্কে সবার স্বচ্ছ ধারণা না থাকার কারণ দেখিয়ে আরো দুই সপ্তাহ পর তা কার্যকর করে সরকার।
এরপর থেকে বিভিন্ন জেলায় শ্রমিকরা ‘স্বেচ্ছায়’ এই কর্মবিরতি শুরু করে।
পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতি যশোরের সাংগঠনিক সম্পাদক হারুন অর রশিদ জানান, ১৪ নভেম্বর যশোরে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে সড়ক আইন ২০১৮ সংশোধনের দাবি করা হয়। এরপর রবিবার সকাল থেকে যশোরের ১৮ রুটের শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি শুরু করেছেন।
তবে -বেনাপোল-যশোর ও যশোর-সাতীরার অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো যাত্রীবাহী বাস চলাচল না করলেও কার, মাইক্রোবাস, ইজিবাইক, মাহেন্ত্র, নসিমন-করিমন জাতীয় ছোট যানবাহন এবং অযান্ত্রিক গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
আশিক সাগর পরিবহন বেনাপোল অফিসের ব্যবস্থাপক মিলন হোসেন বলেন, ঢাকা-কলকাতা ও বেনাপোল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে দূরপাল্লার সব বাস চলাচল করছে। ট্রেন চলছে। তবে অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো বাস চলাচল করছে না। তবে ভারত থেকে আসা যাত্রীরা ট্রেনসহ ছোট ছোট যানবাহনে করে গন্তব্যে যাচেছন।

 আইন সংশোধনের দাবিতে রংপুরে ট্রাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ
রংপুর অফিস, দিনকাল জানান, সম্প্রতি ঘোষিত সড়ক পরিবহনের নতুন আইন সংশোধনের দাবিতে রংপুর নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ট্রাক শ্রমিকরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর কলেজ রোডস্থ ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে এই মিছিল বের হয়। মিছিলটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এর আগে নতুন সড়ক আইন সংশোধনের দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। রংপুর জেলা ট্রাক, ট্যাংকলরী, কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক্টর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হাফিজুর রহমান হাফিজের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মানিক, কার্যকরী সভাপতি জয়নাল আবেদীন, সহ-সভাপতি আশরাফ আলী, নুরুল ইসলাম নুরু, সহ-সাধারণ সম্পাদক সাহিদুল ইসলাম সাজু, আলমগীর হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মকবুলার রহমান আজাদ, অর্থ সম্পাদক কামরুজ্জামান ফারুক, সড়ক সম্পাদক বাদশা মিয়া, জামাল উদ্দিন, হামিদুল ইসলাম, দফতর সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল, প্রচার সম্পাদক হারুন-অর- রশিদ, শ্রমিক কল্যাণ সম্পাদক ফজলুল হক ফজলু, ক্রীড়া ও শিক্ষ বিষয়ক সম্পাদক আনিছুর রহমান আনিছ, সিওবাজার শ্রম কল্যাণ উপ-কমিটির সভাপতি সাহিদুল ইসলাম সাহিদ, পান্ডার দীঘি শ্রমকল্যাণ উপ-কমিটির সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, বর্তমান সরকারের পাস হওয়া নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বেশিরভাগ বিষয় শ্রমিকদের বিপক্ষে। আইনের যেসব ধারা ও জরিমানার বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে, তা মেনে নিয়ে কোনো ভাবেই সড়কে গাড়ি চলানো সম্ভব না। সকল শ্রমিক এই আইনের বিরুদ্ধে। তারা প্রতিবাদ করেছে। অবিলম্বে এই আইন সংশোধন করা না হলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © gtbnews24.com