সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন

পুরুষরা আমার সঙ্গে যৌনসামগ্রীসুলভ আচরণ করছিল

জিটিবি নিউজ টুয়েন্টিফোর : আমি সাদা ও লম্বা একটি পোশাক পরে এক বিকেলে রাস্তায় হাঁটছিলাম। বাতাসে কাঁধছোঁয়া কালো চুল দোল খাচ্ছিল। হঠাৎ একদল ট্রাক ড্রাইভার আমাকে দেখে শিস বাজাল, অশ্লীল মন্তব্য করল। আমার সুখানুভূতি বিস্বাদে পরিণত হলো। নিজেকে পরাজিত মনে হলো। এরপর?

একজন অসুমলিম চীনা নারীর অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে এখানে। যিনি সমাজে চলতে ফিরতে পুরুষের আচরণে নিজেকে কেবলই যৌনবস্তু হিসেবে খুঁজে পাচ্ছিলেন। কিন্তু মুসলিম নারীর হিজাব যেন তাঁর জীবনটাই বদলে দিলো। চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ক্যাথি চিন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি অ্যান্ড উইমেন স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর হিজাব পরিধানের অভিজ্ঞতাসংবলিত লেখাটি ‘আল-তালিব’ ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হয়।

আমি মাত্র সেলুন থেকে বের হলাম। খুব ছোট করে চুল কেটেছি। আমি ‘হেয়ার ড্রেসার’কে বলেছিলাম, সে যেন আমার চুলগুলো একজন পুরুষের মতো করে কেটে দেয়। অসাড় হয়ে বসে ছিলাম। হেয়ার ড্রেসার দক্ষতার সঙ্গে কাঁচি চালাচ্ছিল আর সে থামবে কি না বারবার তা জানতে চাইছিল। কিন্তু আমি থামতে বলিনি। যদিও নিজেকে একজন বিকৃত মানুষ বলে মনে হচ্ছিল।

আমি আমার নারীত্ব মুছে ফেলতে চাইছিলাম
এটা শুধু চুল কাটা ছিল না; বরং তার চেয়েও বেশি কিছু ছিল। চুল কেটে আমি উভলিঙ্গের মতো হতে চাইছিলাম। চাইছিলাম আমার নারীত্ব মুছে ফেলতে। এর পরও কিছু পুরুষ আমার সঙ্গে যৌনসামগ্রীসুলভ আচরণ করছিল। আমি ভুলের মধ্যে ছিলাম। সমস্যা আমার নারীত্বে ছিল না, ছিল আমার লিঙ্গ-পরিচয়ে। পুরুষরা আমার ‘বায়োলজিক্যাল সেক্স’ বা শারীরিক যৌনতাকেই গ্রহণ করেছিল। তারা আমার সঙ্গে তেমনই আচরণ করছিল, যেমন তারা আমাকে দেখছিল। বাস্তবে আমি কেমন, সেটা তারা মূল্যায়ন করেনি। তারা কেন আমাকে নিজেদের মতো করে ভাবে? অথচ আমি জানি, আমি কে।

আমার হিজাব পরিধানের অভিজ্ঞতা
একটি শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা। আমি একটি ম্যাগাজিনের প্রজেক্টে কাজ করার সময় মুসলিম নারীর পোশাক পরেছিলাম। ক্রিনশো বুলেভার্ডে তিনজন মুসলিম পুরুষের সঙ্গে প্রজেক্টটি করতে হয়েছিল। আমি একটি সাদা ফুলহাতা সুতি শার্ট, জিনস ও ‘টেনিস শু’ পরেছিলাম। প্রিন্টের সিল্ক স্কার্ফে আমার মাথা ঢাকা ছিল। মুখমণ্ডল ছাড়া আমার পুরো শরীর আবৃত ছিল। একজন মুসলিম নারীর কাছ থেকে আমি তা ধার নিয়েছিলাম। আমার বিশ্বাস, এটা শুধু বাহ্যিক বেশ ছিল না; বরং তা আমার অনুভূতিকে স্পর্শ করেছিল। অবশ্য আমি সত্যিই জানতাম না, নারীরা কেন হিজাব পরে? আমি এভাবে বলছি, কারণ বিষয়টি ব্যক্ত করার মতো সঠিক শব্দ আমার জানা নেই। আমি ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে বেড়ে উঠিনি। যাহোক, মানুষ আমাকে মুসলিম নারী মনে করল। তারা আমার সঙ্গে ‘যৌনসামগ্রী’সুলভ আচরণ করল না এবং অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করল না। আমি বুঝতে পারলাম, হিজাব পরলে পুরুষের চোখ আমার শরীর চষে বেড়ায় না।

হিজাব পরিধানের সিদ্ধান্ত নিলাম
আমি স্বেচ্ছায় ও সচেতনভাবে হিজাব পরার সিদ্ধান্ত নিই। কারণ, আমি পুরুষের কাছ থেকে সম্মান প্রত্যাশা করি। প্রাথমিকভাবে, একজন ‘উইমেন স্টাডিজ’-এর শিক্ষিকা ও নারী গবেষক হিসেবে এবং পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি লালন করায় আমি স্কার্ফকে নারীর প্রতি ‘অত্যাচার’ মনে করতাম। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনার পর বুঝতে পারলাম, হিজাবকে অবিচার মনে করা একধরনের বর্ণবাদী আচরণ ও অপপ্রচার মাত্র। এমনটি হতো না, যদি ‘রাষ্ট্রীয় আইন’ (আইন প্রণেতা অর্থে) সত্য জানতে ও বুঝতে প্রত্যয়ী হতো।

আমার জীবনের সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক সিদ্ধান্ত
আমি আমাকে আবৃত করে রাখি, যদিও বিষয়টি আমার খুব পছন্দের নয়, তবে এটা আমার জীবনের সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক সিদ্ধান্ত। এখন পুরুষ আমাকে নারী হিসেবে সম্মান করে। আমি আবিষ্কার করেছি, আমি কেমন পোশাক পরছি তার ওপর নির্ভর করে, অন্যরা (পুরুষ) আমার সঙ্গে কেমন আচরণ করবে। এটি একটি বাস্তবতা—যা আমি মেনে নিয়েছি। পরাজয়ের বিপরীতে আমি বিজয় বেছে নিয়েছি। হিজাব পরে আমি আমার যৌনতা আড়াল করেছি, নারীত্ব নয়। এই আড়াল পরবর্তী স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © gtbnews24.com
Web Site Designed, Developed & Hosted By ALL IT BD 01722461335