রবিবার, ২৫ Jul ২০২১, ০৭:২৪ অপরাহ্ন

নোটিশঃ
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জিটিবি নিউজ এর সাংবাদিক  নিয়োগসহ পরিচয় পত্র নবায়ণ চলছে।

ভরণ-পোষণ চেয়ে মামলা করে উল্টো ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রচলিত আইন অনুসারে, ভরণ-পোষণ হচ্ছে স্বামীর দায়িত্ব এবং স্ত্রীর অধিকার। বৈবাহিক সম্পর্কের জন্য থাকা-খাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, চিকিৎসা ও জীবন ধারণের জন্য অন্যান্য যে উপকরণ লাগে, স্ত্রী তা স্বামীর কাছ থেকে পাওয়ার অধিকার রাখেন। স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ বা স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পৃথক হওয়ার পর অধিকাংশ সময় এ ভরণ-পোষণ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। স্বামী স্বেচ্ছায় স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ দিতে চান না। উপায় না পেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন স্ত্রী। করেন মামলা। কিন্তু ভরণ-পোষণের জন্য মামলা করে উল্টো ভোগান্তিতে পড়েন অসহায় নারী। আইনের গ্যাঁড়াকলে দিনের পর দিন আদালতপাড়ায় ঘুরতে হয় তাকে।

ঢাকায় কলহের মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম তিনটি পারিবারিক আদালতে পরিচালিত হয়। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে (২০১৬-২০২০ সাল) পারিবারিক আদালতে ৩৯ হাজার ৭২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বিচার করার পর্যাপ্ত উপাদান না থাকায় পাঁচ হাজার ৩০টি মামলা খারিজ হয়েছে। এক হাজার ২৫২টি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৬৫ শতাংশ।

বাপ্পির সঙ্গে আমার এখনো ছাড়াছাড়ি হয়নি। আমি বাপের বাড়ি থাকি। কিন্তু তিনি আমার ভরণ-পোষণের কোনো টাকা-পয়সা দেন না। ভরণ-পোষণের টাকা-পয়সার জন্য আমি আদালতে মামলা করেছি। মামলার পর আদালতে আসা-যাওয়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। মামলার কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না। আমি এর সহজ সমাধান চাই

২০১৬ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে সাত হাজার ১০৩টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে এক হাজার ২৪০টি এবং রায় হয়েছে ৩৩৫টি মামলার। পরের বছর ২০১৭ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে সাত হাজার ৩৩০টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৯৮১টি এবং রায় হয়েছে ২৯৪টি মামলার। ২০১৮ সালে পারিবারিক মামলা হয় হয়েছে সাত হাজার ৪৯২টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৭৪১টি এবং রায় হয়েছে ১৯০টি মামলার। ২০১৯ সালে পারিবারিক মামলা হয় হয়েছে নয় হাজার ৩৪৫টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে এক হাজার ৩৯১টি এবং রায় হয়েছে ২৭৫টি মামলার। গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে পারিবারিক আইনে মামলা হয়েছে আট হাজার ৪৫২টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৬৭৭টি মামলা এবং রায় হয়েছে ১৫৮টি মামলার। দেখা যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক কলহের মামলা বেড়েই চলছে।

এক কাপড়ে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয় আফিকে
আফি আক্তারের (ছদ্মনাম) সঙ্গে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাপড় ব্যবসায়ী বাপ্পির (ছদ্মনাম) দুই লাখ টাকা দেনমোহরে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি বিয়ে হয়। বিয়ের সময় আফির বাবার বাড়ি থেকে জামাইয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এক লাখ টাকা নগদ ও ৫০ হাজার টাকার আসবাবপত্র দেয়া হয় বাপ্পিকে। বিয়ের পর তাদের সাংসারিক জীবন ভালোই চলছিল। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে বাপ্পি কাপড়ের ব্যবসার জন্য আফির কাছে তিন লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এরপর থেকেই তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। বাপ্পিকে যৌতুকের টাকা আনতে ইন্ধন দেন তারা মা ও বোন। যৌতুকের এ দাবিকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের মধ্যে নানারূপ সমস্যার সৃষ্টি হতে থাকে।

দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বাপ্পি, তার মা ও বোন মারধর করে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন আফিকে। এরপর আফির ঠাঁই হয় তার বাবার বাড়িতে। এরই মাঝে ২০১৮ সালের শেষ দিকে আফির বাসায় বাপ্পি উপস্থিত হয়ে যৌতুকের টাকা চান। আফি দিতে না পারায় তাকে চড়- থাপ্পড়, কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন তিনি। এরপর বাপ্পি সেখান থেকে নিজের বাসায় চলে যান। কিছুদিন পর আফি তার স্বামী বাপ্পির কাছে নিজের ভরণ-পোষণের টাকা চান। কিন্তু বাপ্পি তা দিতে অস্বীকার করেন। এর প্রতিকার চেয়ে ২০১৮ সালের শেষ দিকে ৫২ হাজার টাকা ভরণ-পোষণ বাবদ চেয়ে মামলা করেন আফি। মামলার প্রায় তিন বছরেও কোনো সুরাহা পাননি আফি। মামলা করে এখন উল্টো হতাশায় ভুগছেন তিনি। প্রতি ধার্য তারিখে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে ক্লান্ত আফি।

আদালত প্রাঙ্গণে আফি  বলেন, ‘বাপ্পির সঙ্গে আমার এখনো ছাড়াছাড়ি হয়নি। আমি বাপের বাড়ি থাকি। কিন্তু তিনি আমার ভরণ-পোষণের কোনো টাকা দেন না। ভরণ-পোষণের টাকার জন্য আমি আদালতে মামলা করেছি। মামলার পর আদালতে আসা-যাওয়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। মামলার কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না। আমি এর সহজ সমাধান চাই।’

সাত লাখ টাকা দিয়েও ভালো নেই মোনালিসা
মোনালিসার (ছদ্মনাম) বয়স ২৮ বছর। ২০১১ সালের দিকে তার পরিচয় হয় জুয়েল আহম্মদ জনির (ছদ্মনাম) সঙ্গে। জনি তখন থাকতেন মালয়েশিয়ায়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে জনি দেশে এসে সামাজিকভাবে ২০১৩ সালে তিন লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে করেন মোনালিসাকে। বাঁধেন সংসার।

স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়া স্ত্রীর অধিকার। এই প্রাপ্য অধিকারের জন্য অনেক সময় নারীকে হয়রানির শিকার হতে হয়। স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদ বা পৃথকের সময় যদি একজন জজ ভরণ-পোষণের বিষয়টি নির্ধারণ করে দিতেন, তাহলে এমন হয়রানির শিকার হতে হতো না নারীকে

মোনালিসার অভিযোগ, জনি বিয়ে করলেও তার মনে স্বাভাবিক চিন্তা ছিল না। মোনালিসার কাছে জমানো কিছু টাকা ছিল। বিয়ের প্রথম দিকে সেই টাকা আত্মসাতের জন্য জনি তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন। বিদেশে যাওয়ার অজুহাতে মোনালিসার কাছ থেকে নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার বেচে দুই লাখসহ মোট সাত লাখ টাকা নেন। এরপর জনি বিদেশ চলে যান। সেখান থেকেও মোনালিসার কাছে টাকা চান তিনি। ২০১৪ সালে মোনালিসা সুখের কথা চিন্তা করে ট্রান্সফারের মাধ্যমে জনিকে ৬০ হাজার টাকা পাঠান।

পরে জনি দেশে ফিরে আসেন এবং মোনালিসার কাছে আরও টাকা চাইতে শুরু করেন। জমানো টাকা শেষ হওয়ার পর তার ওপর নির্যাতন শুরু করেন জনি। মোনালিসা বাধ্য হয়ে তার বাবার বাসায় গিয়ে ওঠেন। ২০১৭ সালে মাঝবমাঝি মোনালিসার বাসায় গিয়ে তার কাছে জনি পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। যৌতুকের টাকা না দিলে জনি তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও মারধর করেন এবং মোনালিসার বাসা থেকে চলে যান। এরপর থেকে জনি আর মোনালিসার কাছে ফিরে আসেননি। এমনকি তার ভরণ-পোষণের জন্যও কোনো টাকা পাঠাতেন না।

এই পরিস্থিতিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে মোনালিসা প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা ভরণ-পোষণ চেয়ে জনির নামে ঢাকার আদালতে মামলা ঠোকেন। মামলায় ভরণ-পোষণের পাশাপাশি তার কাছ থেকে নেয়া সাত লাখ টাকাও দাবি করেন মোনালিসা। কিন্তু মামলা করে এখন উল্টো দিশেহারা এই নারী। দিনের পর দিন যায়, শেষ হয় না তার মামলা।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনটি অনেক পুরোনো। এ আইনে মামলা কতো দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে তা উল্লেখ নেই। অনেক সময় বিবাদী আদালতে উপস্থিত হন না। এসব কারণে দিনের পর দিন পারিবারিক মামলাগুলো ঝুলে থাকে। ঝুলে থাকার কারণে হয়রানির শিকার হতে হয় নারীকে

মোনালিসা  বলেন, ‘জনির বিরুদ্ধে মামলা করে আমি এখন দিশেহারা। দিনের পর দিন পার হয়। কিন্তু মামলার কূলকিনারা পাচ্ছি না। ভরণ-পোষণের টাকা না পাওয়ায় আমার চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। জানি না কবে শেষ হবে মামলা।’

ভরণপোষণ আদায়ে স্ত্রীর আইনগত যে অধিকার রয়েছে
১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী ভরণ-পোষণের জন্য স্ত্রীর মামলা করার অধিকার আছে। এটি একটি দেওয়ানি প্রতিকার। এ অধ্যাদেশে ভরণ-পোষণ, দেনমোহর, বিবাহ-বিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব বিষয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা করার কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৯ ধারায় বলা আছে, স্বামী ভরণ-পোষণ দিতে ব্যর্থ হলে স্ত্রী স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করতে পারবেন। চেয়ারম্যান সালিশি পরিষদ গঠন করে ভরণ-পোষণের পরিমাণ ঠিক করবেন এবং সার্টিফিকেট ইস্যু করবেন। স্বামী অথবা স্ত্রী নির্ধারিত পদ্ধতিতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ইস্যুকৃত সার্টিফিকেটটি পুনঃবিবেচনার উদ্দেশ্যে সহকারী জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন এবং এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। স্বামী এরপরও নির্ধারিত ভরণ-পোষণ না দিলে স্ত্রী বকেয়া ভূমি রাজস্বের আকারে তা আদায় করতে পারবেন।

তৃতীয়ত, মুসলিম বিবাহ-বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ অনুযায়ী স্বামী দুই বছর ধরে ভরণ-পোষণ দিতে ব্যর্থ হলে বা অবহেলা করে ভরণ-পোষণ না দিয়ে থাকলে স্ত্রী বিবাহ-বিচ্ছেদের ডিক্রি পাওয়ার অধিকারী হবেন।

ঢাকার আদালতে বেশিরভাগ পারিবারিক আইনের মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী মলয় কুমার সাহা। তিনি  বলেন, ‘স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়া স্ত্রীর অধিকার। এ প্রাপ্য অধিকারের জন্য অনেক সময় নারীকে হয়রানির শিকার হতে হয়। স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদ বা পৃথকের সময় যদি একজন জজ ভরণ-পোষণের বিষয়টি নির্ধারণ করে দিতেন, তাহলে এমন হয়রানির শিকার হতে হতো না নারীকে।’

হয়রানির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ সময় পারিবারিক আদালতের বিচারক থাকেন না। অনেক সময় একজন বিচারক দুটি আদালত পরিচালনা করেন। একজন বিচারক যখন দুটি আদালত পরিচালনা করেন, সেসময় তিনি সাক্ষ্য নিতে পারেন না। অথচ ভুক্তভোগী নারীকে প্রতি ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত হতে হয়। সাক্ষ্য না দিয়ে আদালত থেকে চলে যেত হয়। আবার অনেক সময় বিবাদীপক্ষ সময়ের আবেদন করে মামলা বিলম্বিত করে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম  বলেন, ‘স্বামীর কাছ থকে ভরণ-পোষণ পাওয়া স্ত্রীর অধিকার। বিচ্ছেদের মামলায় নারী বকেয়া ভরণ-পোষণ দাবি করতে পারে। কিন্তু সঠিক সাক্ষ্যের অভাবে তা থেকে বঞ্চিত হতে হয় তাকে। বিচ্ছেদের পর শুধু ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণের আদেশ আসে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে মিথ্যা মোকদ্দমা দায়েরের ঘটনাও ঘটে।’

আইনজীবী খালেদ হোসেন বলেন, ‘১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনটি অনেক পুরোনো। এ আইনে মামলা কতো দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে তা উল্লেখ নেই। অনেক সময় বিবাদী আদালতে উপস্থিত হন না। এসব কারণে দিনের পর দিন পারিবারিক মামলাগুলো ঝুলে থাকে। ঝুলে থাকার কারণে হয়রানির শিকার হতে হয় নারীকে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © gtbnews24.com