০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত মাদ্রাসার ১২ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ-যৌন হয়রানি করেছে সে।

কখনও ছুতোয়, কখনও ভয়ভীতি দেখিয়ে ছুটির পরও টার্গেট করা শিশুছাত্রীকে মাদ্রাসায় থাকতে বাধ্য করতো প্রধান শিক্ষক আল-আমিন। এক্ষেত্রে সে বেশিরভাগ সময় পানি আনানো ও মাদ্রাসা ঝাড়ু দেওয়ানোর ছুতো ব্যবহার করতো। তাতে কাজ না হলে সে ভয়ভীতি দেখাতো। এরপর মাদ্রাসা ফাঁকা হলে ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করতো। আর এভাবে ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত মাদ্রাসার ১২ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ-যৌন হয়রানি করেছে সে। ধর্ষণের অভিযোগে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে আটক হওয়া নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাহমুদপুর ইউনিয়নের মাহমুদপুর এলাকার বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার অধ্যক্ষ (প্রধান শিক্ষক) আল-আমিনের প্রসঙ্গে এই তথ্য জানান র‌্যাব-১১–এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলেপ উদ্দিন।

বাংলা ট্রিবিউনকে আলেপ উদ্দিন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আল-আমিন মাদ্রাসার ১২ ছাত্রীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের কথা স্বীকার করেছে। একইসঙ্গে সে শিশু শিক্ষার্থীদের পর্নোগ্রাফি ভিডিওচিত্র দেখিয়ে এবং তাদের ছবি যুক্ত করে পর্নোগ্রাফি বানিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতো বলেও জানিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ষণ-যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া ১২জন ছাত্রীর খোঁজ পেয়েছি আমরা। ওই ছাত্রীরা আল-আমিনের হাতে নির্যাতিত হওয়ার বর্ণনাও দিয়েছে।’

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরও জানান, ওই অধ্যক্ষের মুঠোফোন ও কম্পিউটারে তল্লাশি চালিয়ে একাধিক ছাত্রীর ছবি (এডিটেড) ও পর্নোগ্রাফি ভিডিও পাওয়া গেছে। সেগুলো জব্দ করে মামলার আলামত হিসেবে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ভুইয়াপাড়ার মৃত আব্দুল জলিল রেনু মিয়ার ছেলে আল-আমিন। প্রায় আট বছর আগে সে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি কান্দাপাড়া এলাকায় আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পাস করে আল-আমিন ফতুল্লা থানা সংলগ্ন মাহমুদপুর পাকা রাস্তার মাথায় এক মসজিদে ইমামতি শুরু করে। ২০১৫ সালের দিকে সে বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসা গড়ে তোলে। ওই মাদ্রাসা চালু হলে ধীরে ধীরে তার আর্থিক অবস্থায় পরিবর্তন আসে। বর্তমানে ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮০ জন। মাসে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সে একহাজার করে ফি নিতো। এছাড়া, বিভিন্ন সময় পরীক্ষার ছুতোয়ও সে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতো।

মাহমুদপুর এলাকার ডিশ ব্যবসায়ী আইনুল হক বলেন, ‘মাদ্রাসা চালুর বেশ অনেক দিন পর হুজুর (আল-আমিন) মাদ্রাসার জন্য কম্পিউটার কিনে, ডিশ ও ইন্টারনেট সংযোগ নেয়। তাকে ভালো মানুষ মনে করতাম, কিন্তু সে যে এমন জঘন্য, ধারণার বাইরে ছিল। আমরা তার কঠিন শাস্তি চাই।’

মাদ্রাসা থেকে একশ’ গজ দূরে রয়েছে ‘বিসমিল্লাহ স্টোর’ নামের একটি দোকান। এর মালিক মোহাম্মদ শরীফ হোসেন বলেন, ‘ইমামের (আল-আমিন) কর্মকাণ্ডে আতঙ্ক কাজ করছে মনে। আমরা চাই, কোনোভাবেই যেন সে ছাড়া না পায়। আমার তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

নাম প্রকাশ না করে এক অভিভাবক বলেন, ‘মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক যে কাজ করেছে, এরপর আর এই মাদ্রাসায় ছেলে-মেয়েকে রাখতে চাই না।’

আরও বেশ কয়েকজন অভিভাবক একই কথা জানান। তারা আরও বলেন, বছরের মাঝামাঝি সময়ে ছেলেমেয়েদের অন্য কোথাও ভর্তি করাটা মুশকিল জেনেও তারা আর এখানে ছেলেমেয়ে পড়াবেন না।

এ ব্যাপারে র‌্যাব-১১–এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক আলেপ উদ্দিন বলেন, ‘সিদ্ধিরগঞ্জের কান্দাপাড়া, মিজমিজি, সানারগাড়া, পাইনাদী, নতুন মহল্লাসহ বেশ কয়েকটি ঘনবসতি এলাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনও শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি, ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির শিকার হলে এবং আমাদের জানানো হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা  নেবো।’

জানতে চাইলে ফতুল্লা থানার ওসি আসলাম হোসেন বলেন, ‘আল-আমিনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পৃথক দুইটি মামলা হয়েছে। এ দুই মামলার বিচার যেন দ্রুত শুরু হয়, সেজন্য পুলিশ অল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত করে আল-আমিনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *